মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ই-কৃষি

ই-কৃষি
ই-কৃষি হচ্ছে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে যেমন রেডিও, টিভি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল, সিনেমা, সিডি, ডিভিডি ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে কৃষকদের মাঝে কৃষি সংক্রান্ত সব তথ্যাবলী পৌঁছে দেয়া। আমাদের মতো দেশে কৃষকদের জ্ঞান সীমিত পর্যায়ে। সেক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করা সহজ হবে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এ মাধ্যমগুলো কৃষকদের তথ্য সরবরাহে সহায়তা প্রদান করবে। আমাদের কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানে শিক্ষিত হয়ে উঠবে।

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি
আমাদের দেশে যত বর্গ কিলোমিটার জায়গা রয়েছে ততটুকু জায়গার সদ্ব্যবহার করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে এ জায়গাগুলোকে উপযোগী করতে হবে উত্পাদনশীল ফসল সমৃদ্ধকরণে। উন্নত প্রজাতির উচ্চ ফলনশীল ধান কিংবা অন্যান্য ফসল উত্পাদনে প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উপকরণ ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের ফলে আমাদের কৃষিতে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হবে। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন কলের লাঙ্গলের ফলা ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন উন্নত দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের দেশে সেসব আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উত্পাদন বাড়ানোর কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। অবশ্য এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সমপ্রতি একটি তথ্যে জানা গেছে, দেশে তৈরি হচ্ছে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি।

আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি
বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি লক্ষ্য করা যায়। এ যন্ত্রপাতিগুলো উন্নত দেশের কৃষিতে পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে চীনে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখানে আধুনিক কৃষি ফার্ম বা খামার গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে র্যাংকিংয়ে চীন প্রথম। প্রায় ৩০০ মিলিয়নের অধিক কৃষক কাজ করছেন অত্যন্ত সফলভাবে। যেসব কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষি বিপ্লবে ভূমিকা রাখছে সেসব আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

কম্বাইন হার্ভেস্টর : উন্নত দেশে কম্বাইন হার্ভেস্টর এমন এক ধরনের কৃষি যন্ত্র যা ফসল কাটা, আবর্জনা হতে ফসল দানা আলাদা করা ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমেরিকা, জার্মান, চীনসহ প্রভৃতি উন্নত দেশে এ যন্ত্রের ব্যবহার লক্ষণীয়।

পাওয়ার টিলার : এটি একটি ট্রাক্টরের সহিত অতিরিক্ত সংযুক্ত যন্ত্র যা মাটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গভীর থেকে আলগা করার মাধ্যমে চাষের উপযোগী করে। এটি আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

Plough : এক ধরনের কৃষি যন্ত্র যা মাটিকে বীজ বপনের উপযোগী করে প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি প্রাথমিক টুল মাটিকে যথাযথভাবে সংমিশ্রণ করতে সহায়তা করে থাকে। এটি দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে এ টুলটি ট্রাক্টরের সহিত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।

সাব সয়লার : এটি চষড়ঁময যন্ত্রের ন্যায় কাজ করলেও মাটিকে প্রায় ১২ ইঞ্চি গভীর হতে আলগা করে। এতে শক্ত ধারাল ব্লেড রয়েছে।

টু হুইল ট্রাক্টর : এটিও মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করতে বিশেষত বসতবাড়ির ভিটেতে কাজে আসে। এটি ইতালি, জার্মানি, আমেরিকা, জাপান, ভারত, বাংলাদেশসহ প্রভৃতি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্রডকাস্ট সিডার : এটি সাধারণত বীজ বপন, সার দেয়া, কীটনাশক ছিটানো প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয়।

সিড ড্রিল : এ যন্ত্রটি ব্রডকাস্ট সিডার অপেক্ষা আধুনিক। এ যন্ত্রের সহায়তায় নির্দিষ্ট অবস্থানে বীজ বপন করা যায়।

এছাড়া আরও কিছু যন্ত্র যেমন মেনুয়র সেপ্রডার, সেপ্রয়ার, বিন হার্ভেস্টার, চেজার বিন, কর্ন হার্ভেস্টার, ইরিগেশন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োগ
উন্নত দেশগুলো কৃষি ফসল উত্পাদনে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি ডিজাইন করা হয়েছে বাস্তবতার ভিত্তিতে। যেমন বীজ বোনা, চাষাবাদ করা, চারা রোপণ, পোকামাকড় থেকে শস্যকে রক্ষা করা, মাঠ থেকে শস্য তোলা এবং শস্যের প্রক্রিয়াজাত প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রযুক্তির প্রয়োগে চীনে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে সহজলভ্য দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। এর অংশ হিসেবে আমাদের দেশে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাওয়ার টিলার, পাওয়ার রিপার, ধান ও গম মাড়াই কল, ভেনটিরেটিং ড্রায়ার, ভুট্টা মাড়াই কল ইত্যাদি যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক।

সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
আমাদের দেশের জন্য চাই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আমাদের জন্য সহজে কার্যকর হয়ে ওঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে ঘর-গৃহস্থালী থেকে শুরু করে পানি ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি শক্তি, কৃষি ও যন্ত্রপাতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

বায়োগ্যাস প্রযুক্তি
এ প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষত গৃহস্থালী কাজের জন্য অর্থাত্ রান্না ও বৈদ্যুতিক কাজে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি অনন্য। এ প্রযুক্তি অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাশ্রয়ী অর্থাত্ কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

রি-সাইকেল প্রযুক্তি
রি-সাইকেল এমন একটি প্রযুক্তি যা পুনরায় ব্যবহার করা যায়। যেমন বায়োগ্যাস প্রযুক্তিতে পরিবেশের মারাত্মক কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসে না। বরং এর সঙ্গে মাটির উর্বরতার বিষয়টি সম্পৃক্ত । অর্থাত্ রি-সাইকেল প্রযুক্তিতে এ ক্ষেত্রে জৈব সার উত্পাদন করা যায়।

সৌর বিদ্যুত্ প্রযুক্তি
সূর্যের আলো এ বিদ্যুত্ প্রযুক্তির একমাত্র উপাদান। এ প্রযুক্তি অনেক সাশ্রয়ী।

আর্সেনিকমুক্ত পানি প্রযুক্তি
এ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর কৃতিত্ব উল্লেখ করার মতো, সারা বিশ্বে যা ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই বিজ্ঞানীদ্বয় হচ্ছেন ডক্টর আবুল হুসসাম এবং ডক্টর আবুল মনির। বাংলাদেশের এ দু’জন বিজ্ঞানী পানিকে আর্সেনিকমুক্ত করার জন্য আবিষ্কার করেন সাশ্রয়ী সনো ফিল্টার।

খামারজাত সার তৈরি প্রযুক্তি
পশু-প্রাণীর বর্জ্য থেকে বিশেষত গোবর এই সারের মূল উপাদান। তবে তা সুষম করতে হয়।

আবর্জনা পচা সার প্রযুক্তি
প্রতিদিনের আবর্জনা থেকে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সার উত্পাদন করা হয়।

কম্পোস্ট সার তৈরি প্রযুক্তি
আবর্জনা পচা সার ও এর উপাদান একই। তবে এর উপাদান স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ সার তৈরি হয়।

আরও কিছু প্রযুক্তিগত সেবা...
যেসব প্রযুক্তিগত সেবা আমরা পেয়ে আসছি তা আমাদের জন্য সূচনা মাত্র। প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সেবার নিশ্চয়তা। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এসব প্রযুক্তিগত সেবাগুলো হচ্ছে :

কমিউনিটি বেতার
সরকার কমিউনিটি বেতার স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রদান করেছেন। এ কমিউনিটি বেতার কৃষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে সহায়তা করতে সক্ষম হবে। কৃষকদের মাঝে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মুঠোফোনে সহায়তা
মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে কৃষি সেবা কল কৃষকদের মাঝে প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা প্রদান করবে। নির্দিষ্ট কল সেন্টারে সরাসরি ফোন দিয়ে জরুরি তথ্য জানা যাবে অনায়াসে। ইতিমধ্যে কৃষকরা এমনকি ক্ষেতে বসে এ সেবা পেয়ে আসছেন।

টিভিতে কৃষিবিষয়ক সমপ্রচার
অবশ্য টিভিতে কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান সমপ্রচার হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এছাড়া বিটিভি, বাংলাভিশনের নাম উল্লেখ করা সমীচীন। তবে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এ ধরনের অনুষ্ঠানের সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষি সম্পর্কিত স্বতন্ত্র চ্যানেল করা যেতে পারে। কৃষিবিষয়ক সমপ্রচারগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা জানতে পারবে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ যাবতীয় তথ্য, খবরাখবর, নতুন নতুন প্রযুক্তির তথ্য।

ওয়েবসাইটে তথ্যসেবা
ওয়েব রিসোর্স একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স হতে পারে। অবশ্য কিছু কিছু কৃষিভিত্তিক ওয়েবসাইটে তথ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে। আরও ব্যাপকভাবে এ তথ্যসেবা দেয়া যেতে পারে, যাতে কৃষকরা তাত্ক্ষণিকভাবে তথ্য পেতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবাসুলভ করা এবং সে সঙ্গে ১০০ ডলারের মতো কম বাজেটে ল্যাপটপ সহজলভ্য করা।

কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা কৃষিতে যথাযথ পরিবর্তন আনতে পারিনি। অবশ্য এর মূল কারণ আধুনিক প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারা। উন্নত দেশগুলোতে কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে আশাতীতভাবে। আমাদের দেশে সরকারিভাবে কৃষি প্রযুক্তির বিকাশে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় কৃষি ক্ষেত্রে ঘটে যেতে পারে একটি নীরব বিপ্লব। কৃষির উন্নয়নে এদেশ সমৃদ্ধিশালী হবে একদিন।